সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

এনকাউন্টার




ডেকাডেন্সডেকাডেন্স । নিজের মনে মনেই আওড়ায় সুনির্মল । প্রায়ই এরকম হয় । মন খারাপ লাগে ।

চোখ কান বুজে ছোটবেলা থেকেই চলতে শেখেনি সুনির্মল । একটু অন্য রকম হলেই আবেগতাড়িত হয়ে পরে । নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করে । কিন্তু হয় না । মাথাটা গরম হয়ে যায় । কান দুটো লাল । জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়তে থাকে । বুক ধড়পড় করে । ঠাঁটিয়ে একটা চড় মারতে ইচ্ছা করে ।

ঘটনাটা এমন কিছু না- ও বটে- আবার হ্যাঁ - ও বটে । যে যেভাবে দেখে । যে ভাবে ভাবে । সুনির্মল অন্যরকম - হয়ত বা-



তাই না বলে পারে না--

---এই যে ভাই --- চলন্ত অটোতে বার বার থু থু ফেলছ- যে কোনও সময়ে আমার গায়ে এসে পড়বে তো---!

--- লাগলে বলবেন ।

---- মানে !? কি বলতে চাইছ ?

---- তা- কি করব ?

----মানে ?

---- মানে থু থু টা মুখে এসে গেলে কি করব ?

এমন একটা জবাব ! সুনির্মল কি করবে বুঝতে পারে না । প্রচণ্ড রাগ হয়। কথা হারিয়ে যায় । এর কি উত্তর হতে পারে ! চড় মারবে ? ইডিয়ট ননসেনস -- এসব বলবে ? কিংবা শুয়োরের বাচ্চা-বাড়ীতে শিক্ষা পাওনি ?

পাশের লোক দুটো মুচকি হাসছে  ! আশ্চর্য ! সব মিলিয়েই সুনির্মলের গা গুলিয়ে ওঠে । মন খারাপ লাগে । কোন ও রকমে বলে – ‘ব্যস- নামব’ । একটা দশ টাকার নোট অটোচালক কে দিয়ে এক দৌড়ে পাশের গলিটায় ঢুকে পড়ে । অটো চালকের গলা ভেসে আসে – ‘কি হল- আপনি তো এখানে নামেন না ! আরে ব্যালেন্সটা তো নিয়ে যাবেন !’

কান্না উঠে আসে । ঠাণ্ডা হাওয়ায় - অন্ধকারে - একা একা বেশ কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকে সুনির্মল ।

 

 

সব শুনে সুনির্মলের বউ অনিমা বলে - ঠাটিয়ে একটা চড় মারলে না কেন ?

- ‘মারা যায় না’ - মনে মনে বলে সুনির্মল ।

পাশের বাড়ীর অবিনাশ বাবু রাগত স্বরে বলে ওঠেন -

- ‘সব শুয়ারের জাত - বুঝলেন কিনা । এত্ত সাহস কি কইরা পায় কে জানে! এর এট্টা বিহিত হওয়ান লাগবো ।

- ‘এর কোনও বিহিত নেই - এ তো অমোঘ অনিবার্যতা । এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল - ! '- মনে মনে বলে সুনির্মল ।

এসব কথা মনে মনে বলতে বলতে - বলতে বলতে - সুনির্মল আজকাল বিড়বিড় করে কথা বলে । কথাগুলো কেউ বুঝতে পারে না - বা বোঝার চেষ্টাও করে না । কিন্তু তিনটে শালিক , দুটো ডাহুক , তিনটে বক আর দুটো ফিঙে ওর কথা বুঝতে পারে ! আরে একটা মাছরাঙাও বুঝত ! এখন মাছরাঙাটা নেই । বড় পুকুরটা - অর্ধেক বুঝিয়ে- চারিদিকে সিমেন্ট বাঁধানো রাস্তা বানিয়ে - একটা দোতালা গেস্ট- হাউস হয়েছে । এটা নাকি ইকো - টুরিজিম । আর সেই ইকো - তে মাছরাঙাটা হারিয়ে গেছে ।  দুটো কাঠবাদাম - চারটে কদম -আর একটা সব গাছ ছাড়িয়ে তালগাছ কাটা পড়েছে ! টুরিষ্টদের জন্য রাস্তা চাই !

তবে কি সব কিছুই হারিয়ে যাবে ? সুনির্মলের ভয় করে । একটা অন্য রকম ভয় । সব পাখী - সব গাছ - সব  মানুষ - কোথায় যাচ্ছে ওরা ! তবে কি সুনির্মলকেও এ ভাবেই --!

         বৌ এর সাথে প্রায় ঝগড়া করেই কলকাতার উপকণ্ঠে এ বাড়ীটা করেছিল সুনির্মল। পূব খোলা । তাই বাড়ীটার নাম দিয়েছিল ‘পূবের হাওয়া’ । অবশ্য নামটার পিছনে আর একটা ইতিহাস ও ছিল । সেটা জানত একমাত্র সুনির্মলই - আর জানত মাছরাঙাটা। মাছরাঙাটার আসল নাম ছিল কালু । সত্তর দশকের পূবের হাওয়ার সম্পাদক । তারপর একদিন পুলিশের গুলিতে অথবা এনকাউন্টারে মারা গিয়েছিল কালু ।

তারপর ওই কালুই মাছরাঙা হয়ে জন্মেছিল । সেই মাছরাঙাটাও বোধহয় গেস্ট হাউসের মোটা বেঢপ ভুড়ির বাইকওয়ালা কনট্রাকটরের সাথে এনউন্টারে মারা গয়েছিল । কালুর খবর সুনির্মল পেয়েছিল - বেশ কিছুদিন পর । কিন্তু মাছরাঙার খবরটা অবশ্য পায়নি । মাস খানেক আগে হঠাৎই ওর বাড়ীর নামটা পাল্টে দিয়েছিল । লিখেছিল মাছরাঙা’ । অবিনাশ বাবু একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করেছিল -

- হেইটার কি মানে হইল - সুনির্মল বাবু। ‘পূবের হাওয়া’ নাম টা তবু বোঝা যায়। কিন্তু –’

-বোঝা যায় না । ‘পূবের হাওয়াতো একটা দর্শন । একটা ভালবাসা । অবশ্য মনে মনেই বলেছিল কথাটা ।

             এ ভাবেই মনে মনে কথাটা বলতে বলতে - বলতে বলতে - সুনির্মলও হঠাৎই একদিন কালু অথবা মাছরাঙার মত হারিয়ে গিয়েছিল । কারও কারও মতে সুনির্মলও এনকাউন্টারে মারা গিয়েছিল । অবশ্য এনকাউন্টার টা ঠিক কার সাথে বোঝা যায়নি । রহস্যই থেকে গেছে । এমন কি ওর বিয়াল্লিশ বছরের বিবাহিত স্ত্রীও বুঝতে পারেনি - লড়াইটা ঠিক কার সাথে !

সত্যি বলতে কি আমিও বুঝতে পারিনি । আমার কথা কেন ? কারন আমি ওর খুব কাছের বন্ধু ছিলাম । আমি চেষ্টা করেছিলাম- আমার মতন করে আমার ছোট্ট খেয়ায় ওর কাছে পৌঁছাতে । ওর মনের তরঙ্গায়িত স্রোতে আমার খেয়াও গেল হারিয়ে । আমি এখন একা একা ঘুরে বেড়াই । সুনির্মলদের কাছেই থাকি । ওরা জানে না- বোঝেও না যে আমি ওদের পাশেই আছি । আসলে পাশে থাকাটাও তো আর একটা পূবের হাওয়া !

সুনির্মল দোতালার লম্বা পূবের ঘরে শুয়ে আছে । এখন ভো র। সূর্য ওঠার ছন্দ সবে শুরু হয়েছে । ঘরে এখন ওর স্ত্রী সুনির্মলের একটা হাত ধরে নিথর হয়ে খাটের পাশের চেয়ারটায় বসে আছে । উঠোনের আমগাছে আম্রপল্লবেরা আর দুলছে না ! কাঠ গোলাপ দুটো হঠাৎই টুপ করে খসে পড়ল ! লজ্জাজবা গুলো একসাথে জড়িয়ে আছে যেন । ডানদিকের ছোট্ট নারকেল গাছের পাতার দল চুপি চুপি খুব ধীর লয়ে দুলছে । অবিনাশ বাবুর স্ত্রী মিতালী প্রায় দৌড়েই ঘরে ঢুকলেন । - ‘কখন হল এসব । ভাল মানুষটা - কালকেই তোমার দাদার কাছে স্বাতী নক্ষত্রের কথা বলেছিলেন -’

-’- স্বাতী - সপ্তর্ষি - শুকতারা - কত কথা কইতে আছিল- অখন নিজেই চইল্যা গেল- ওই তারা গুলানের কাছে’- বলতে বলতে অবিনাশ বাবুর চোখে জল নেমে এল ।

            সুনির্মল যখন সন্ধ্যে বেলা সামনের বাগানে অবিনাশ বাবুর সাথে তারাদের গল্প বলছিলেন- তখন আমি ওর কাছেই ছিলাম । কিছুক্ষন - পর অবিনাশ বাবু চলে গেলেন । আর কি আশ্চর্য একটু পরেই পাওয়ার কাট - ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এল । আর সুনির্মল নিশ্চিন্ত মনে আকাশের তারাদের সাথে মনে মনে কথা বলতে শুরু করল । কথা বলতে বলতে- বলতে বলতে - রাত বাড়তে লাগল । দুর্গা উপর থেকে নেমে  বাগানে এসে বলল - ‘বাবু রুটি কইরে রেখেছি- আপনি এলি মা খাবেন ।সুনির্মল আরও কিছুক্ষন বসে ছিল। দুর্গা আবারও ডাকতে এল । সুনির্মল একই ভঙ্গিমায় আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে । মুখে একটা অনাবিল খুশির হাসি । আমি ওর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে গান গেয়ে উঠলাম - ‘এই আকাশে আমার মুক্তি-’- আমার গান কেউই শুনতে পেল না । বিড়বিড় করে সুনির্মল বলে উঠল - ‘মুক্তি চাইলেই কি মুক্তি পাওয়া যায় !? রোম সাম্রাজ্যের ক্রীতদাস থেকে এই যে আমি - আমরা এখনও সেই ক্রীতদাসই রয়ে গেলাম । দোকানে গিয়ে আমি সেই ব্রান্ডটাই চাইব - যেটা আমাকে মিডিয়া বলতে শিখিয়েছিল । আর মিডিয়াকে শিখিয়েছিল সেই ব্রান্ডের মালিকরা । তার মানে মিডিয়াও অন্য অর্থে ক্রীতদাসই হল । এসব কথা ভাবতে ভাবতে - ভাবতে ভাবতে সুনির্মল মুচকি হেসে উঠে দাঁড়িয়েছিল । আলো জ্বলে উঠল । তারারা গেল হারিয়ে ।

            দোতালার খাবার টেবিলে ঢেঁড়স ভাজা আর রুটি । মুসুর ডাল আর অল্প কিছুটা ভাত । আলু পোস্ত । এক প্লেট ছানা ।

            সুনির্মলের স্ত্রী অনিমা বাতের ব্যথায় খুব কষ্ট পাচ্ছে । ফিজিওথেরাপি চলছে । খাবার টেবিলের পাশে একটা ইজিচেয়ারে আধশোয়া-  দুর্গা জলচকিতে হটওয়াটার ব্যাগ দিয়ে অনিমার পায়ে সেঁক দিচ্ছে । অনিমার হাতে রিমোট । টি. ভি. তে একটা সিরিয়াল চলছে । এই সিরিয়ালটা শেষ হলেই অনিমাকে খেতে দেবে দুর্গা । ইজিচেয়ারে বসেই অনিমা খাবে । পাশে একটা ট্রলি টেবিলে অনিমার রুটি ইত্যাদি থাকবে । ভাত অনিমার খাওয়া বারণ । সিরিয়ালের ব্রেক চলছে । বিজ্ঞাপনে একটা আরশোলার ছটফটানি । হঠাৎ টি. ভি. তে চোখ পড়তেই সুনির্মল মুখটা ঘুরিয়ে নিল ।

-'মিমি- ফোন করেছিল । ও কাল সকালে মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে এখানে আসবে । তোমার কিছু লাগলে ব’ল ও নিয়ে আসবে ।' অনিমা বলল। সুনির্মল হয়ত তখনও আরশোলাটার কথা ভাবছিল- কোনও উত্তর দিল না ।

-'দিগন্ত- আজ রাতের ফ্লাইট ধরবে । ওর একটা জরুরী মিটিং আছে কলকাতায় । মিটিং এর ফাঁকে পারলে একবার আমাদের কাছে আসবে ।'- অনিমা কথা বলতে বলতে হাতে রাখা রিমোট দিয়ে টি. ভি র সাউন্ডটা একটু বাড়াল । তারপর বলল- ওর সেক্রেটারি একটু আগে ফোন করেছিল ।

সুনির্মল এবারে একটু মুচকি হাসল ।

সিরিয়াল চলছে । সুনির্মলের খাওয়া শেষ । সুনির্মল এখন দাঁত মাজবে - উইদাউট পেস্ট । উপরের পাঁচটা- আর নীচের চারটে - এই কটা দাঁতেই সুনির্মল কাজ চালিয়ে নেয় । চলছে তো আর কি !

আবার ব্রেক । অনিমা টি. ভি. র সাউন্ডটা কমিয়ে সরাসরি সুনির্মলের দিকে মুখ ঘোরালো । সুনির্মলের ফোকলা মুখ ওয়াশ বেসিনের উপরের আয়নায় দেখতে পেল, -'তুমি কি শুনতে পেলে- দিগন্ত কাল এখানে আসতে পারে-'

হঠাৎই  সজোরে চিৎকার করে সুনির্মল বলে উঠল- কে দিগন্ত-? আমি ঠিক চিনতে পারছি না!

সুনির্মলের এ- হেন শব্দে সচকিত অনিমা হা করে তাকিয়ে রইল । টি. ভি. তে- আবার সেই আরশোলার ছটফটানির দৃশ্যটা !

আমি বুঝতে চেষ্টা করছিলাম সুনির্মলের এনকাউন্টারের বিষয়টা । সুনির্মলের কালু অথবা মাছরাঙার মত হারিয়ে যাওয়া- অথবা এনকাউন্টারে মৃত্যু - গল্প না সত্যি - রহস্যটা ঠিক কোথায় ? আমি ওর বন্ধু - কিন্তু আমি তো সুনির্মল নই- যে ওর সমস্ত অনুভূতির খবর রাখতে পারব ! তবু-!

সেই রাতে গভীর অন্ধকারে পুবের জানালাটা ধরে কেঁদেছিল সুনির্মল । অনিমা টের পায় নি । অনিমাও অনেক রাত পর্যন্ত জেগেছিল । দুশ্চিন্তা -তো বটেই । সত্যিই কি সুনির্মল দিগন্তকে চিনতে পারে নি !? কেন অত রেগে গিয়েছিল !? সুনির্মল তো ঠাণ্ডা মাথার মানুষ । তবে কি সেক্রেটারির ফোন শুনেই - বুঝতে পারছিল না- অনিমা !

তারপর ভাবতে ভাবতে - ভাবতে ভাবতে - ঘুমের ওষুধের ঘোরে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল ।

সুনির্মল যখন রাতের আকাশে পূবের জানালায় কাঁদছিল- আমি ওর পিঠে হাত রাখলাম- তুমি কাঁদছ কেন সুনির্মল ? তোমার কিসের কষ্ট ? '- ও আমার কথা শুনতে পেল না ! ওর পিঠে  আমার হাত - ও টেরই পেল না ! আরশোলার ছটফটানিটা টের পেল !

সুনির্মল বুঝতে পারল - আজ রাতেই ও এনকাউন্টারে মারা যাবে । কাল সকালে অনিমা কোনও কথা বলবে না- শুধু ওর হাতটা ধরে রাখবে । মিমি কে খবর দেবে দুর্গা । মিমি কিছুক্ষন ভেউ ভেউ করে ফোনে কাঁদবে । তারপর ওর পাঁচ বছরের রিমিকে স্কুল ড্রেস পরাবে । টিফিন বক্স গুছিয়ে দেবে । শান্তনুকে বলবে একসাথেই বের হতে । রিমি- দাদুকে দূর থেকেই প্রনাম করবে । শান্তনু- ড্রাইভারকে বলবে রিমিকে স্কুলে পৌঁছে দিয়েই চলে আসতে । তারপর স্বর্গরথ - ফুল - ধুপ- ডাক্তার অন কল- ডেথ সার্টিফিকেট ! দিগন্ত- শান্তনুকে হোয়াটসঅ্যাপ এ মেসেজ পাঠাবে !-  ‘ম্যানেজমেন্ট মিটিং - এটেন্ড না করলে কেরিয়ারের খুব ক্ষতি হবে- সুতরাং ও সরাসরি বার্নিং ঘাটে পৌঁছে যাবে- রিচুয়ালসের জন্য - তারপর আবার অফিস হয়ে -রাতে বাড়ীতে মার সাথে দেখা করবে-!

এবং আশ্চর্য এটাই-- সুনির্মলের ভিসন বা পরিজ্ঞান - একদম ঠিক ! যেমনটা ও ভেবেছিল- ঠিক তেমনটাই ঘটে গেল পর পর সবকিছু ।

আজ রবিবার । এখন সকাল দশটা । অবিনাশ বাবুর বাড়ীর সামনে ওনার স্ত্রী মুখটা গোমড়া করে দাঁড়িয়ে আছেন । পাশের গেটের সামনেই স্বর্গরথ । স্বর্গরথে ঢাকা পরে আছে প্রবেশদ্বার । মাছরাঙা - নামটা দেখা যাচ্ছে না ।

মাছরাঙার স্বপ্নসাথী সুনির্মলের নিশ্চিন্ত দেহটা দোতালার পূবের জানালায় শায়িত । নিথর মুখে একটা তাচ্ছিল্ল্যের হাসি - ভাবটা এমন যে আসলে তোমরা আমায় এনকাউন্টারেও মারতে পার নি - যেমনটি পার নি কালু অথবা মাছরাঙাকে হারাতে ।

ভোর থেকে একই ভঙ্গীতে সুনির্মলের একটা হাত ধরে বসে আছে অনিমা । পাশে দুর্গা দাড়িয়ে । মিমি মার কাঁধে হাত রেখে সুনির্মলের দিকে তাকিয়ে আছে ।

অবিনাশ বাবু কিংকর্তব্যবিমুঢ় । শান্তনু শূন্যদৃষ্টিতে দেয়ালে টাঙানো ডেট ক্যালেন্ডারের পাতায় নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে ।

একটু দুরেই মনোজের দোকান । পাড়ার দু-চারজন দোকান করতে এসে নিয়ম রক্ষার্থে বলাবলি করছেন-

- 'ভদ্রলোক বেশ ভাল ছিলেন-'

- হুম- সাতে পাঁচে থাকতেন না- '

-'ছেলে- তো- শুনেছি- মুম্বাইতে কোনও বিশাল কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার ।'

- 'গাড়ীটা কার-?'

-'মেয়েরই হবে-'

- 'চলুন যাই -একবার দেখা করে আসি- '

- 'কি হবে ? - যে গেল সে তো গেলই ! আমার আবার একটা জরুরী মিটিং আছে-ক্লাবে ।'

- 'মনোজ তুমি কি শ্মশানে যাবে ? '

- 'দেখি -!'

 ওরা কথা বলতে সুনির্মলের বাড়ীর সামনে এসে দাঁড়ালেন । মিনিট তিনেক । সবাই ব্যস্ত ।

অবিনাশ বাবু দোতালার জানালা থেকে ওদের দেখে নীচে নেমে গেটের কাছে আসতে আসতে ছোট্ট ভীড়টাও গেল মিলিয়ে ।

 

শবদেহের গাড়ীতে দুর্গার বর- হারান । গাড়ীতে শান্তনু আর অবিনাশ বাবু । ফুল-ধুপকাঠি-চন্দন-আতর-সাদা কাপড়ে সাজানো সুনির্মল - 'স্বর্গরথে' দোতালার পূবের জানালায় অনিমা -মিমি-অবিনাশ বাবুর স্ত্রী আর দুর্গা । গাড়ীটা মিলিয়ে যেতেই মিমি ডুকরে কেঁদে উঠল- বাবা ---! অনিমা- খুব নিচু স্বরে স্বগতোত্তির মতন মিমির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- মিমি- এনকাউন্টার মানে কি রে ?

এনকাউন্টারের মৃত্যু রহস্যটা বোঝার জন্য- আমি একটু আগেই শ্মশানে পৌছালাম । দিগন্তের সেক্রেটারি ইতি মধ্যেই শ্মশানে হাজির । আমি এগিয়ে গেলাম । মেয়েটি সুন্দরী না হলেও সুশ্রী এবং অবশ্যই আধুনিকা । হাল্কা গেরুয়া কনুই ছুয়ে যাওয়া লম্বা ব্লাউজ । সাদা ফুলের কাজ করা সিফন শাড়ী । কপালে সবুজ টিপ । গলায় লম্বা ঝোলানো মুক্তোর মালা । কানে ঝোলানো সবুজ দুল । একটা কালো রঙের স্কার্ফ- তাতে রজনীগন্ধার মোটিফ - মাথায় বেনুনীর সাথে সুন্দর ভাবে জড়ানো - হয়ত বসের পিতৃদেবের মৃত্যু - সুতরাং এমন পোশাক ।

-হ্যালো - না- স্যার- বডি এখনও এসে পৌঁছায়নি । - হ্যাঁ-

-'I am waiting here right at Burning-ghat ' -------- ‘yes- sir-'

 -'উম....[ মৃত দেহের লাইনটা এক মুহূর্ত দেখে নিয়ে]- -৮ টা Dead Body এখনও ' -       O.K - Sir-I will inform you-'

-'Right sir - O.K - sir. '

.....দিগন্ত চেম্বারে বসে আছে । বেয়ারাকে ডাকে । - . কফি-- . 'ডিসগাস্টিং- বোগাস রিচুয়ালস- অল রাবিশ... . '

..... যেহেতু দিগন্ত সুনির্মলের ছেলে - সুতরাং আমারও অধিকার আছে- এই সব ভাবতে ভাবতে- ভাবতে ভাবতে- বলেই ফেললাম-

-'তুমি ঠিকই বলেছ। এসব রিচুয়ালসের কোনও মানেই হয় না! কিন্তু বিপ্লবটা তোমার সুবিধা অনুযায়ী হলে তো হবে না- তোমার যেটা অপছন্দ - সেখানেই বিপ্লব- -আর যেখানে তোমার সবকিছু ঠিকঠাক- সেখানে বাঃ বেশ তো--চলছে চলুক না । পাল্টাতে হলে তো সবটা ধরেই ঝাঁকুনি দিতে হয়- তাই না-?'

যথারীতি দিগন্ত আমার কথা শুনতে পেল না । আর শুনতে পেলেও - -হয়ত বলত- 'যাঃ -মাইরী- জ্ঞান দেবেন না কাকু ! '

সব মিলিয়ে এবার আমার মন খারাপ হবার পালা !

সুনির্মলের কাছে - পূবের হাওয়া - কালু- অথবা মাছরাঙার যে অর্থ - বিশ্বায়নের আধুনিকতার কাছে তা মূল্যহীন - পাগলামো !-- এনকাউন্টার ?

...... বেশ কিছুদিন পর - সুনির্মলের সাথে কার্জন পার্কে হঠাৎ দেখা । এতদিন পর - ও - আমাকে দেখতে পেল । আমাকে জড়িয়ে ধরল । সুনির্মল মারা গেছে প্রায় মাস খানেক । তার মানে ওর থেকে আমি বছর খানেকের সিনিয়র !

অবশ্য আমি সুনির্মলের মত এনকাউন্টারে মারা যাই নি । আমি মারা গিয়েছিলাম সরকারী হাসপাতালে - প্রায় বিনা চিকিৎসায় আর অবহেলায় ! হয়ত ওটাও ছিল অন্য কোনও এনকাউন্টার !

- 'তুই এখানে ? ' সুনির্মল বলল

-'হুম- আমি তো প্রায়ই আসি- এখানে-'

-'স্মৃতি হাতড়াতে ? '

- 'ঠিক ধরেছিস ।'

-' নে -বিড়ি- খা- গৌতম বিড়ি ।'

আমি সুনির্মলের থেকে বিড়িটা নিতে নিতে বললাম- 'তুই তো এসব খেতিস না ! '

-'এখন খাই । বেশ লাগে । তা -তুই এখানে কি করছিস ? '

একটু অন্যমনস্ক ভাবে আমি বললাম- 'আসলে আমি একটা পাড়া খুঁজে বেড়াচ্ছি ! '

- 'তুই পাড়া খুঁজছিস ? ভাল। আমি তো একটা মানুষ খুজছি ! '

সুনির্মলের কথায় হকচকিয়ে গেলাম !

-  ' চল হাঁটবি ? '- সুনির্মল বলল ।

-'কোথায় ? '

-'ওই যে - একটা মিছিল আসছে-! '

আমি কোনও মিছিল দেখলাম না ! তবুও সুনির্মলের সাথে ওর কল্পনার মিছিলে পা মেলালাম ।

 



 

 

 


মন্তব্যসমূহ